প্রথম অভিজ্ঞতা সুখের হয়নি
জীবনে কতকিছুরই প্রথম অভিজ্ঞতা হয়। কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়ানো বা উপার্জনের প্রথম অভিজ্ঞতাটা একটু দাগ কেটে যায় মনে। আমারও দাগ কেটে গেছে, কিন্তু সুখকর হয়নি।
আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পড়াশোনার খরচ যোগাতে কম-বেশি টিউশন করাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
¯œাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েই খুঁজতে থাকি টিউশন। বন্ধু, বড় ভাই, ছোট ভাই কারো কাছেই টিউশনের সন্ধান না মেলায় পরে শহরের অলিতে গলিতে ছাপার হরফে ফোন নাম্বারসহ লাগিয়ে দিই ‘পড়াতে চাই’ নামক এ-ফোর সাইজের কাগজ।
আমার অনেক বন্ধু এসব দেখে মজা নিত। তবে তাদের এসব ঠাট্টা আমি কখনো মাথায় নিতাম না। কারণ দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল। অন্তত একটা টিউশন আমার খুবই দরকার ছিল। নইলে যে ঝরে পড়তে হত।
যাই হোক প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বিজ্ঞাপন দেওয়ার সপ্তাহ খানেক পর একজন অভিভাবক ফোন দেন আমাকে। বললেন তার মেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে, তাকে পড়াব কি না। সম্মানী ১৫০০ টাকা, সপ্তাহে ছয় দিন দুই ঘন্টা করে পড়াতে হবে।
আমি তখন কোনকিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেলাম। পরদিন বাসায় গেলাম পড়াতে। পড়ালাম প্রায় আড়াই ঘন্টার কাছাকাছি। ছোট্ট মেয়ে, তাই একটু-আধটু দুষ্টুমি করত। প্রথম দিকে বকা দিতাম না। কিন্তু এক মাস যাওয়ার পর তার দুষ্টুমির মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে অসহ্য লাগত। পড়ানোর অভিজ্ঞতা এটাই প্রথম; তাই বিরক্ত লাগাটাই বরং স্বাভাবিক।
এক পর্যায়ে ভাবছিলাম ছেড়ে দিব টিউশনটা। পরে মাথা ঠান্ডা করে হিসাব-নিকাশ করে দেখলাম, ছেড়ে দিলে মাস শেষে যে ১৫০০ টাকা পাই সেটাও তো পাব না। বরং সহ্য ক্ষমতা বাড়িয়ে টিউশনটা করলেই ভাল হবে। পরে চোখে মুখে প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে আরও একমাস চালিয়ে গেলাম।
ছোট্ট মেয়েটা বই খাতা বাসার বাইরে ফেলে দিত, আমি আবার গিয়ে সব কুড়িয়ে নিয়ে আসতাম। মাঝে মাঝে পড়ার টেবিলের ওপর ওঠে বসে থাকত। তারচেয়েও বিরক্তিকর ব্যাপার হলো ওকে পড়ানোর কোন সুনির্দিষ্ট সময় নেই। ওর আম্মু একেকদিন একেক সময় আসতে বলত। সবমিলে তিন মাস যাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেই যে ছেড়েই দিব।
আন্টিকে যেদিন বলতে যাচ্ছিলাম এই কথা, ঠিক ওইদিনই কাকতালীয়ভাবে আমাকে দাওয়াত করলেন তিনি। ব্যাচেলর মানুষ দাওয়াত একদম মিস করলাম না। কিন্তুু খাওয়ার পর আমি যেন কেমন একটা আবেগি হয়ে গেলাম।
না! পারলাম না আর বলতে। তারপর আরও একটা মাস বিরক্তি চেপে গিয়ে পড়ালাম। এরপর চলে আসল স্কুলের মূল্যায়ন পরীক্ষা। পরীক্ষার সময় তো আর টিউশন ছাড়া যায় ই না। বড্ড বেমানান দেখায়। এই ভেবে পরের মাসেও আর এই টিউশন ছাড়া হলো না।
এরপর মেয়েটির মূল্যায়ন পরীক্ষার ফলাফল দিল। ছাত্রী গণিত আর ইংরেজীতে ফেল করল। এরপর কি আমাকে আর ছেড়ে দেওয়ার কথা বলতে হয় নাকি!! তারাই আমাকে বাদ করে দিল। তারপর? তার আর কোন পর নেই! প্রথম অভিজ্ঞতাটা এমনই তিক্ত আর অমসৃণ ছিল।
লেখক: শিক্ষার্থী, অনার্স ৪র্থ বর্ষ, রোল নং-২১১৩, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, রাঙামাটি সরকারি কলেজ

কোন মন্তব্য নেই